নৌ বাণিজ্য দপ্তরের তদারকির সুফল চট্টগ্রাম বন্দরে নতুন জাহাজে পণ্য পরিবহন বেড়েছে ২৫ বছরের পুরনো জাহাজ আসা কমেছে

0
364

এ .সিদ্দিকী, চট্টগ্রাম : পণ্যবাহি যেসব বিদেশি জাহাজ চট্টগ্রাম বন্দরে জেটিতে ভিড়ে তা এতদিন মানসম্পন্ন কিনা নিয়মিত ভাবে যাচাই করা হতো না। এরফলে ২৫ থেকে ৩০ বছরের পুরণো জাহাজও পণ্য নিয়ে জেটিতে ঢুকার সুযোগ পেতো। আর এসব জাহাজের পুরণো যন্ত্রপাতির কারণে বন্দরে পণ্য উঠানামার দক্ষতা কম থাকতো; এতে জাহাজ দুর্ঘটনার কবলে পড়ার ঝুঁকি তৈরী হতো। বন্দর প্রবেশ পথ বা চ্যানেল অচলের শঙ্কা থাকতো।
গত কয়েকবছর ধরে এসব জাহাজ জেটিতে ভিড়ার পর তদারকি করছে সরকারের নৌ বাণিজ্য অধিদপ্তর। এতে বেশ সুফলও মিলেছে। পুরাতন জাহাজ আসা কমেছে, বেড়েছে নতুন জাহাজ আসার হার। এর ফলে চট্টগ্রাম বন্দরের ভাবমূর্তি বিদেশে উজ্জ্বল হয়েছে।
নৌ বাণিজ্য দপ্তরের হিসাবে, গত তিনবছরে মানসম্পন্ন নয় এমন সাতটি পণ্যবাহি জাহাজ চট্টগ্রাম বন্দরে আসার পর আটক করেছে দপ্তরটি। এসব জাহাজ আর্ন্তজাতিক মানদন্ড মেনে চলার উপযোগি নয়। ২০১৫ সালে এই ধরনের জাহাজ আটকের সংখ্যা ছিল পাঁচটি, ২০১৬ সালে একটি, ২০১৭ সালে একটি এবং ২০১৮ সালের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত আটক হয়েছে একটি। তদারকির কারণে এই ধরনের  নিম্নমানের  জাহাজ আসা কমেছে; সুফলের চিত্র দেখা যাচ্ছে এই তথ্যে।

সর্বশেষ তদারকি করতে গিয়ে চলতি সেপ্টেম্বর মাসে ২২ বছরের পুরনো একটি কন্টেইনার জাহাজ ‘পল আবরাও’ আটক করেছে সমুদ্র পরিবহন অধিদপ্তর। ভারতীয় পতাকাবাহি জাহাজটি আমদানি পণ্যবাহি কন্টেইনার নিয়ে গত ৯ সেপ্টেম্বর বন্দরের এনসিটি টার্মিনালে ভিড়ে। যাচাইয়ের পর মানসম্পন্ন না হওয়ার বিষয়টি ধরা পড়লে জাহাজটি আটক করা হয়। তবে রপ্তানিকারকের সুবিধার্থে পণ্য নামানোর জন্য জাহাজটিকে শ্রীলংকার কলম্বো বন্দরে ফেরত পাঠানো হয়। মান শর্ত পুরণ করা সাপেক্ষে সেটি আবারো চট্টগ্রাম বন্দরে আসবে।
জাহাজের জরিপ কর্মকর্তা (নটিক্যাল সার্ভেয়ার) জানান, জরিপের পর দেখা গেছে জাহাজটিতে তেল নিঃসরন হচ্ছে যা সমুদ্রের পরিবেশের জন্য চরম ক্ষতিকারক। জাহাজের হ্যাজ কাভার জলরোধী  ছিল না। জাহাজের ব্যবস্থাপনাও মানসম্পন্ন ছিল না, সব মিলিয়ে জাহাজটি আর্ন্তজাতিক মানসম্পন্ন ছিল না।

চট্টগ্রাম বন্দরে আসা পণ্যবাহি সব জাহাজে এই নজরদারির সক্ষমতা আছে কিনা জানতে চাইলে তিনি বলেন, সব জাহাজকে আমরা তদারকি করি না আবার করাও যায় না। ইন্ডিয়ান ওসান এমওইউ অনুযায়ী যেসব জাহাজের বিভিন্ন ত্রুটি আছে কেবল সেগুলোই আমরা নজরদারি করি। মুলত চট্টগ্রাম বন্দরে ভালো মানের জাহাজ আসা নিশ্চিত করতে এই নজরদারি করা হচ্ছে।

চট্টগ্রাম বন্দর জেটিতে ১৩ সেপ্টেম্বর জাহাজ ভিড়ার তালিকা পর্যালোচনা করে নৌ বাণিজ্য অধিদপ্তরের তথ্যের সত্যতা মিলেছে। ওইদিন বন্দর জেটিতে থাকা ১৭টি জাহাজের মধ্যে চারটি ছিল খোলা পণ্যের জাহাজ বাকিগুলো ছিল কন্টেইনার জাহাজ। কন্টেইনার জাহাজের ওইএল বাংলাদেশ জাহাজই কেবল ১৯৯৫ সালের তৈরী অর্থ্যাৎ ২৩ বছরের পুরণো। আর সাধারন কার্গো জাহাজের মধ্যে গ্রেট রয়েল হচ্ছে ২৪ বছরের পুরণো। চারটি জাহাজ ১৯ বছরের পুরণো, নয় বছর বয়সী জাহাজ রয়েছে তিনটি, ছয় বছর বয়সী জাহাজ আছে একটি, পাঁচ বছর বয়সী দুটি, চার বছরের একটি, ২০১৭ সালের সর্বশেষ তৈরী নতুন দুটি জাহাজও রয়েছে বন্দরে।
জানতে চাইলে নৌ বানিজ্য অধিদপ্তরের প্রিন্সিপাল অফিসার প্রকৌশলী শফিকুল ইসলাম জানান, তদারকির ফলে চট্টগ্রাম বন্দরে মানসম্পন্ন জাহাজ আসা বেড়েছে এতে কোন সন্দেহ নেই। বন্দরে আসা সব জাহাজের ডকুমেন্ট আমরা তদারকি করতে পারি ঠিকই ফিজিক্যালি সবগুলো জাহাজে গিয়ে তদারক করা যায় না।
তিনি বলছেন, তিনজন সার্ভেয়ার দিয়ে আমরা সর্বোচ্চ ১০ শতাংশ জাহাজ অনেক কষ্টে তদারকি করতে পারি। এখন দেশে বন্দরের সংখ্যা বেড়েছে তাই জাহাজের সংখ্যাও বাড়ছে এজন্য আমাদের দরকার ১২ থেকে ১৫ জন জরিপকারক। ১৯৮২ সালে অর্গানোগ্রামে ৫শ থেকে ৬শ জাহাজের জন্য যে জরিপকারক ছিল জাহাজের সংখ্যা চার হাজার হওয়ার পরও জরিপকারক সংখ্যা একই।

জানা গেছে, আর্ন্তজাতিক মানসম্পন্ন পণ্যবাহী জাহাজ চট্টগ্রাম বন্দরে জেটিতে ভিড়ার ফলে বিদেশে চট্টগ্রাম বন্দরের ভাবমূর্তি উজ্জ্বল হয়েছে।

জানতে চাইলে চট্টগ্রাম বন্দর চেয়ারম্যান কমডোর জুলফিকার আজিজ বলেন, এটা নিশ্চিত এখন অধিক পুরনো জাহাজ বন্দরে ভিড়ে না। এক বছর আগে তৈরী সম্পূর্ণ নতুন জাহাজও এখন পণ্য নিয়ে জেটিতে ভিড়ছে। নতুন জাহাজ আসা শতভাগ নিশ্চিত করতে পারলে বন্দরের পণ্য উঠানামার গতি আরও বাড়তো। বন্দর প্রবেশপথ নিারপদ থাকতো, দুর্ঘটনা বা জাহাজ বিকলের হার একেবারে কমানো যেতো।

এরপরও কিছু কিছু আমদানিকারক কমদামে পণ্য পরিবহন করতে বিদেশি পুরণো জাহাজ ভাড়া করে থাকে। কমদামে জাহাজ ভাড়া করে চট্টগ্রাম এনে পণ্য খালাস করতে গিয়ে অনেক ক্ষেত্রেই তারা বিপদে পড়ে এবং আর্থিক ক্ষতির মুখোমুখি হয়।

পুরণো জাহাজ জেটিতে ভিড়ালে কি সমস্যায় পড়তে হয় জানতে চাইলে বার্থ অপারেটর পঞ্চরাগ উদয়ন সংস্থার পরিচালক রফিকুল আনোয়ার বাবু বলেন, একটি জাহাজের ক্রেন নষ্ট হলে অনেক কর্মঘন্টা নষ্ট হয়, যা বন্দরের পণ্য উঠানামার গতির ওপর প্রভাব পড়ে। আমদানিকারকের আর্থিক ক্ষতি বেড়ে যায়।

উল্লেখ্য, বন্দর চ্যানেল থেকে কর্ণফুলী নদী হয়ে জেটিতে প্রবেশ করতে গেলে একটি বড় বাঁক অতিক্রম করতে হয়। আর এই বাঁক এলাকায় আছে নৌ বাহিনীর সদর দপ্তর এবং সেখানে অনেকগুলো গুরুত্বপূর্ণ প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম রয়েছে। পুরণো এসব জাহাজে পণ্য পরিবহন করতে গিয়ে দুর্ঘটনা হলে ক্ষতির পরিমান হতো ভয়াবহ।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here