ট্রানজিট বন্দর হিসেবে যাত্রা চট্টগ্রাম বন্দরের

0
630
নিজস্ব প্রতিবেদক

ট্রানজিট পণ্য নিয়ে প্রথমবার চট্টগ্রাম বন্দরে ভিড়েছে কোস্টাল জাহাজ ‘সেঁজুতি’। ভারতের কোলকাতা বন্দর থেকে চার কন্টেইনার পণ্য নিয়ে জাহাজটি ভিড়েছে চট্টগ্রাম বন্দরের এনসিটি-১ জেটিতে। আজ মঙ্গলবার রাতেই জাহাজ থেকে নামিয়ে পণ্যগুলো সড়কপথে বাংলাদেশের আখাউড়া স্থলবন্দর দিয়ে ভারতের আগরতলা হয়ে আসাম ও ত্রিপুরা যাবে।

পরীক্ষামূলক পণ্য পরিবহনের উদ্যোগ সফল হলে এই রুটে পণ্য পরিবহন শুরু করবে ভারত। কারণ কোলকাতা থেকে আগরতলা সড়কপথের দুরত্ব ১৬শ কিলোমিটার; সময় লাগে ৩ দিন। কিন্তু চুক্তির অধীনে এই রুট ব্যবহার করলে সময়ও কম লাগবে; অর্থও সাশ্রয় হবে। অর্থ্যাৎ কলকাতা থেকে ভারতের ওই সাত রাজ্যে দ্রæত ও সাশ্রয়ে পণ্য পরিবহন সম্ভব হবে।

উল্লেখ্য, চট্টগ্রাম ও মোঙলা বন্দর ব্যবহার ভারতের উত্তর পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্যে পণ্য পরিবহনের জন্য ২০১৮ সালে দুই দেশের সচিব পর্যায়ে চুক্তি হয়। এরপর ২০১৯ সালের ৫ অক্টোবর ভারতের নয়াদিল্লীতে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির মধ্যে বৈঠকে এনিয়ে এসওপি স্বাক্ষর হয়। নানা জটিলতা পেরিয়ে ২০২০ সালের মার্চে পরীক্ষামূলক পণ্য পরিবহন শুরু দিন ঠিক হয়। কিন্তু করোনাভাইরাস মহামারির কারণে সেটি পিছিয়ে যায়। এখন সেটি শুরু হলো। চুক্তির পর চট্টগ্রাম বন্দর ব্যবহার করে ট্রানজিট পণ্য পরিবহনের উদ্যোগ এই প্রথম। এর মধ্য দিয়ে চট্টগ্রাম বন্দর ‘ট্রানজিট বন্দর’ হিসেবে স্বীকৃতি পেলো।

জানতে চাইলে চট্টগ্রাম বন্দর সদস্য (সদস্য ও পরিকল্পনা) জাফর আলম শিপিং এক্সপ্রেসকে বলেন, এখন থেকে শিপিং সেক্টরে নতুন পরিচিতি পেলো চট্টগ্রাম বন্দর। আগে চট্টগ্রাম বন্দরেই শুধুমাত্র পণ্য আসতো এখন চট্টগ্রাম বন্দর ব্যবহার করেই পণ্য যাবে অন্যদেশে। এটা আমাদের জন্য গর্বের বিষয়।

তিনি বলেন, আমরা এখনো জানি না ভারতের ওই উত্তর পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্যে এই রুট ব্যবহার করে কী পরিমান পণ্য যাবে। এখন ৩০ লাখ একক কন্টেইনার উঠানামা করি সুতরাং কয়েক হাজার বাড়তি কন্টেইনার সামাল দেয়া সম্ভব। তবে আগামী কয়েকমাসের মধ্যে পতেঙ্গা কন্টেইনার টার্মিনালের তিনটি জেটি অপারেশনের এলে ট্রানজিটের বাড়তি কন্টেইনার সামাল দেয়া আমাদের পক্ষে সহজ হয়ে যাবে।

জানা গেছে, ভারতের শ্যামপ্রাসাদ মূখার্জি (সাবেক কলকাতা বন্দর) বন্দর থেকে উপকূলীয় নৌপথে রওনা দিয়ে পণ্যবাহি প্রথম জাহাজ ‘সেঁজুতি’ ২০ জুলাই দিবাগত রাত একটায় চট্টগ্রাম বন্দরের বহির্নোঙরে পৌঁছে। উপকূলীয় বা কোস্টাল জাহাজ ভিড়ানোর জন্য বরাদ্দকৃত বন্দরের এনসিটি-১ জেটিতে জাহাজ না থাকায় ১২ ঘন্টা পর আজ মঙ্গলবার জাহাজটি বন্দর জেটিতে ভিড়ে। জাহাজ থেকে নামিয়ে দুই কনটেইনার ডালজাতীয় পণ্য ট্রেইলরে করে চট্টগ্রাম-আখাউড়া-আগরতলা সড়কপথ হয়ে ভারতের ত্রিপুরা এবং বাকি দুই কন্টেইনার টিএমটি স্টিলবার ট্রেইলরে করে আগরতলা যাবে। পরীক্ষামূলক এই চালানে সময়, ব্যয় সাশ্রয়ী এবং সফল হলে পরবর্তীতে এই রুটে নিয়মিত পণ্য পরিবহন শুরু হবে।

জাহাজটির শিপিং এজেন্ট ম্যাঙ্গো লাইন লিমিটেডের ব্যবস্থাপক হাবিবুর রহমান শিপিং এক্সপ্রেসকে বলেন, জাহাজটিতে ৩শ একক কন্টেইনার রয়েছে; এরমধ্যে মাত্র চার কন্টেইনার ট্রানজিট পণ্য। ট্রানজিট কন্টেইনার নীচে থাকায় জাহাজ থেকে নামিয়ে ট্রেইলরে তুলতে রাত ১১টা পর্যন্ত সময় লাগবে। তবে ট্রেইলর প্রস্তুত জাহাজের হুক পয়েন্ট থেকে সরাসরি সড়কপথে রওনা দিবে। এজন্য কাস্টমসের যাবতীয প্রস্তুতি সম্পন্ন হয়েছে।

আর্ন্তজাতিক জেনারেল এগ্রিমেন্ট অফ ট্যারিফ এন্ড ট্রেড (গ্যাট) চুক্তি অনুযায়ী, ট্রানজিট বা ট্রান্সশিপমেন্ট পণ্য পরিবহনে সরাসরি শুল্ক আরোপের সুযোগ নেই। তবে দেশের অবকাঠামো ব্যবহার, নিরাপত্তা নিশ্চিতসহ পণ্য পরিবহন সেবা দিয়ে বিভিন্ন মাশুল আরোপের সুযোগ আছে। বন্দর ও কাস্টমস ব্যবহার করতে দিয়ে সরকার সেই মাশুলই আরোপ করবে।

জাতীয় রাজস্ব বোর্ড গত ১৩ জুলাই এক আদেশে ভারতীয় ট্রানজিট বা ট্রান্সশিপমেন্টের পরীক্ষামূলক পণ্য চালানের জন্য মাশুল নির্ধারন করে দিয়েছে। এই সাতটি মাশুল হলো প্রতি চালানের প্রসেসিং ফি ৩০ টাকা, প্রতি টনের জন্য ট্রান্সশিপমেন্ট ফি ৩০ টাকা, নিরাপত্তা মাশুল ১০০ টাকা প্রতি টন, এসকর্ট মাশুল প্রতি টন ৫০ টাকা এবং অন্যান্য প্রশাসনিক মাশুল প্রতি টন ১০০ টাকা। এ ছাড়া স্ক্যানিং ফি (প্রতি কনটেইনার) ২৫৪ টাকা এবং বিধি অনুযায়ী ইলেকট্রিক সিলের মাশুল প্রযোজ্য হবে। এর বাইরে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ পণ্য উঠানামা মাশুল, রিভার ডিউজ, পোর্ট ডিউজ আদায় করবে।

চট্টগ্রাম বন্দর ও চট্টগ্রাম কাস্টমস-এই দুই সরকারী প্রতিষ্ঠান ছাড়াও ট্রানজিট পণ্য বাংলাদেশের সড়কপথ ব্যবহারের জন্য সরকার নির্ধারিত টোল ও মাশুল আদায় করবে সরকারী আরেক প্রতিষ্ঠান সড়ক বিভাগ। যদিও পরীক্ষামূলক চালানের ক্ষেত্রে সড়ক ব্যবহারের টোল আদায় বহাল রাখলেও অন্য মাশুল সাময়িকভাবে মওকুফ করে দিয়েছে সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তর।

উক্ত তিন সরকারী প্রতিষ্ঠানের মাশুল ছাড়াও চট্টগ্রাম বন্দর থেকে পণ্যচালানটি সড়কপথে আখাউড়া স্থলবন্দর পর্যন্ত পৌঁছাতে বাংলাদেশি ট্রাক-ট্রেইলর ব্যবহার করবে। চট্টগ্রাম বন্দর থেকে এক কন্টেইনার পণ্য আখাউড়া হয়ে ভারতের আগরতলা পৌঁছতে ট্রেইলর ভাড়া হবে ৩৫ হাজার টাকা; পুরোটাই বাংলাদেশি ব্যবসায়ীরা পাবেন। সেই সাথে পণ্য চালান কাস্টমস, বন্দরে ছাড়ের প্রক্রিয়ার সাথে যুক্ত থাকায় বাংলাদেশি সিঅ্যান্ডএফ প্রতিষ্ঠানগুলো বাড়তি আয়ের সুযোগ পাবেন।

চট্টগ্রাম চেম্বার সভাপতি মাহবুবুল আলম শিপিং এক্সপ্রেসকে বলেন, ‘দুদেশই লাভবান হবে এর মাধ্যমে। আমদানি পণ্য ভারত থেকে কম সময়ে, কম খরচে পৌঁছবে। আর ভারত অত্যন্ত কম সময়ে তাদের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় সাত রাজ্যে পণ্য পরিবহন করতে পারবে। এছাড়া বাড়তি একটি কন্টেইনার আসা মানে অর্থনীতিতে এর আয় যোগ হওয়া।’

# ২১ জুলাই ২০২০

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here